২৩শে জানুয়ারি, ২০১৮ ইং | ১০ই মাঘ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ৬ই জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৩৯ হিজরী

শিরোনাম :

ইতিহাসের এই দিনে বাংলাদেশর বিজয়ের কথা বলে

মোশতাক রাইহান | টাইমসবাংলা টোয়েন্টিফোর.কম/নিউজ

 

ইতিহাস আজীবন কথা বলে। ইতিহাস মানুষকে ভাবায়, তাড়িত করে। প্রতিদিনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা কালক্রমে রূপ নেয় ইতিহাসে। সেসব ঘটনাই ইতিহাসে স্থান পায়, যা কিছু ভালো, যা কিছু প্রথম, যা কিছু মানবসভ্যতার অভিশাপ-আশীর্বাদ।

স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও বাংলাদেশের পিছু ছাড়েনি পাকিস্তান। ১৯৭১ সাল বাংলাদেশের কাছে সবচেয়ে গৌরবের। আর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সাল পাকিস্তানের ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক বছর।

প্রতিবছর বাংলাদেশ যখন ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবস হিসেবে উদ্যাপন করে, তখন পাকিস্তানিরা তাদের পরাজয়ের এ দিনটি পালন করে ‘ফল অব ঢাকা’ অর্থাৎ ঢাকায় পাকিস্তানের কর্তৃত্বের পতন বা হাতছাড়া হওয়ার দিন হিসেবে। একাত্তরের ঘটনাবলিকে কেন্দ্র করেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে বারবার টানাপড়েন দেখা দিয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের যে স্থবিরতা চলছে এর কারণগুলোও ১৯৭১ সালের সঙ্গে সম্পর্কিত। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তানের কাছে ঐতিহাসিক চারটি দাবি তুলে ধরেছিল। এগুলো হলো—মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যার জন্য বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা, উত্তরসূরি রাষ্ট্র হিসেবে অবিভাজিত সম্পদে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা আদায়, আটকে পড়া পাকিস্তানিদের স্বদেশে প্রত্যাবাসন এবং বাংলাদেশকে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান।

বাংলাদেশের এসব দাবির ব্যাপারে পাকিস্তান সাড়া তো দেয়ইনি, উল্টো মুক্তিযুদ্ধকে কটাক্ষ, জঘন্যতম গণহত্যা চালিয়ে ৩০ লাখ বাংলাদেশিকে হত্যার ইতিহাস অস্বীকার করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাংলাদেশি কূটনীতিক বলেন, গত কয়েক বছরে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপড়েনের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল যুদ্ধাপরাধের বিচার। পাকিস্তান তার দেশের যুদ্ধাপরাধীদের নিজেই বিচার করার কথা দিয়ে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে কার্যত তাদের দায়মুক্তি দিয়েছে। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকায় আত্মসমর্পণের পর থেকে পাকিস্তান যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকাতে ও যুদ্ধাপরাধ ইস্যু আড়াল করতে জোর প্রয়াস চালিয়েছে।

ওই কূটনীতিক বলেন, ২০১৩ সালে আমেরিকান সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ গ্যারি জে বাসের লেখা ‘দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম : নিক্সন, কিসিঞ্জার অ্যান্ড আ ফরগটেন জেনোসাইড’ গ্রন্থ পশ্চিমা সমাজকে নতুন করে এ বিষয়ে আলোড়িত করে।

এরই মধ্যে বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধের বিচারের উদ্যোগ নিলে সারা বিশ্বে আবারও পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিষয়টি সামনে চলে আসে।

একাত্তরে পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের এ দেশের রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর যেসব কুলাঙ্গার সহযোগিতা করেছিল, গত কয়েক বছরে তাদের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করে সাজা দেওয়ার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখায় পাকিস্তান। এর জবাবে বাংলাদেশ একে এ দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করে প্রতিবাদ জানিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য, জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি কূটনীতিকদের বহিষ্কার করারও নজির আছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে যখন জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেসকোয় বৈশ্বিক প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আয়োজন চলছিল, তখন ঢাকায় নিজেদের হাইকমিশনের ফেসবুক পেজে স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিতর্কিত ভিডিও প্রচার করে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে টানাপড়েনের জন্ম দেয় পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রতি এ অঞ্চলের দেশগুলোর অনাস্থার কারণে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) কর্মকাণ্ডও স্থবির হয়ে আছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, ২০১০ সালের পর থেকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। ২০১০ সালের বৈঠকে বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি দাবি জানায়। ১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বিদেশি সাহায্য হিসেবে আসা প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার ঢাকায় স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানে রক্ষিত ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় ওই অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে ব্যাংকের লাহোর শাখায় স্থানান্তর করা হয়। ওই অর্থ সরাসরি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে।

১৯৭১ সালের আগে অখণ্ড পাকিস্তানের প্রায় ৪৩২ কোটি ডলারের সমপরিমাণ সম্পদে হিস্যার জন্যও বাংলাদেশ দাবি জানিয়ে আসছে। বাংলাদেশ মনে করে, ১৯৭১ সালের আগে পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা বিবেচনায় বাংলাদেশ ওই সম্পদের ৫৬ শতাংশ, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবদান বিবেচনায় ৫৪ শতাংশ এবং সমতার নীতি অনুসরণ করলে ৫০ শতাংশের দাবিদার।

আটকে পড়া পাকিস্তানিদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ পাকিস্তানকে তাগিদ দিয়েও ইতিবাচক সাড়া পায়নি। ২০০৬ সালে জাতিসংঘে শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) সমীক্ষা অনুযায়ী, সে সময় বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানির সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার।

পাকিস্তান কেবল বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে প্রচারণাই চালায়নি, ঢাকার গুলশানে মুক্তিযোদ্ধাদের নামে সড়কের নামকরণের ব্যাপারেও আপত্তি জানিয়েছিল।

এ প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, পাকিস্তান একাত্তরে যে ভুল করেছিল তা থেকে আর বেরিয়ে আসতে পারেনি। পাকিস্তান তার নিজ দেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অঙ্গীকার করে ফিরিয়ে নিয়ে আর বিচার করেনি। বাংলাদেশের সঙ্গে যে চুক্তিগুলো করেছিল সেগুলোর প্রতি যথাযথ সম্মান দেখায়নি। অথচ অন্য একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশের বিচারপ্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করেছে। এসব করে পাকিস্তান মোটেও লাভবান হয়নি। উল্টো পাকিস্তান আজ একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র।

সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘বাংলাদেশের চেয়ে আয়তনে পাঁচ গুণ বড় দেশ হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান আজ এ দেশের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। আমাদের মাথাপিছু আয়, আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ, রিজার্ভ, গড় আয়ু পাকিস্তানের চেয়ে বেশি।’

ওয়ালিউর রহমান বলেন, ‘পাকিস্তান তার দেশের সবার রাষ্ট্র হতে পারেনি। একটি দেশে কেবল সামরিক বাহিনী থাকলেই চলে না, সুশাসন থাকতে হয়। আমরা দেখেছি, কিভাবে পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছে।’

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ উঠলেই পাকিস্তান বাংলাদেশকে অতীতের ইস্যুগুলো নিষ্পত্তি হয়ে গেছে উল্লেখ করে অতীত ভুলে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। তবে বাংলাদেশ জোর দিয়ে বলেছে, বাংলাদেশের জনগণ রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা ও বিজয় অর্জন করেছে।

ইতিহাসের এই দিনের গুরুত্বের কথা মাথায় রেখে টাইমস বাংলার পাঠকদের জন্য লেখা ইতিহাসের এই দিনে বাংলাদেশের কথা বলে।

ইতিহাস :

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭, শনিবার। ০২ পৌষ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ। একনজরে দেখে নিন ইতিহাসের এই দিনে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য ঘটনা, বিশিষ্টজনের জন্ম-মৃত্যু দিনসহ গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু বিষয়।

ঘটনা
১৯০৪ – কলকাতার প্রথম দৈনিক সান্ধ্য পত্রিকা ‘সন্ধ্যা’ প্রকাশিত হয়।
১৯৫০ – সাইপ্রাসের জনগণ তাদের দেশের ওপর ব্রিটিশ আধিপত্য পরিসমাপ্তির লক্ষ্যে স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু করে।
১৯৭১ – পাকিস্তানিদের পরাজিত করে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম। এ দিন নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। সেদিন ঢাকার কেন্দ্রস্থলে রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের পক্ষে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন জেনারেল জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি। এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যৌথবাহিনীর প্রধান জেনারেল জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ও বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর উপ-সর্বাধিনায়ক ও ডেপুটি চিফ অব স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবদুল করিম খোন্দকার। বাংলাদেশের বিজয় দিবস হিসেবে প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর দিনটি বিশেষভাবে উদযাপিত হয়। ২২ জানুয়ারি, ১৯৭২ তারিখে প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে এ দিনটিকে বাংলাদেশে জাতীয় দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয় এবং সরকারিভাবে এ দিনটিতে ছুটি ঘোষণা করা হয়।
১৯৭২ – বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকর হয়।
১৯৭২ – বঙ্গবন্ধু সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
১৯৯১ – কাজাকিস্তান নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করে।

জন্ম
১৭৭৫ – জেন অস্টেন, ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক।
১৯১৭ – আর্থার সি ক্লার্ক, একজন বিখ্যাত বিজ্ঞান কল্পকাহিনী লেখক এবং উদ্ভাবক।
১৯০৬ – মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, বাঙালি কবি।
১৯৪০ – মাহমুদুন্নবী, বাংলাদেশি সঙ্গীতশিল্পী।

মৃত্যু
১৮৫৯ – ভিলহেল্ম গ্রিম, জার্মান লেখক।
১৯০১ – খাজা আহসানউল্লাহ, ব্রিটিশ ভারতের ঢাকার নবাব।
১৯৬৫ – সমারসেট মম, ব্রিটিশ কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার।
১৯৯৫ – ফিরোজ সাই, কণ্ঠশিল্পী।

 

শনিবার, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৭